দশমীর দিন পান্তাভাত ও ইলিশমাছের টক নিবেদন করা হয় দেবীকে

শান্তিপুর, শুভদীপ রায় চৌধুরী: বঙ্গের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো, এই উৎসব বহুবছরের প্রাচীন। ভবিষ্যপুরাণে এই যুক্তির সপক্ষে লিখিত রয়েছে যে, যে দেশেতে দেবীর পুজো হয় সেই দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না, কেউ কোন দুঃখ পায় না বা কারও অকালমৃত্যুও হয় না। আবার কৃত্যচিন্তামণি গ্রন্থে লেখা রয়েছে-
‘পূজিতা সুরথেনাদৌ দুর্গা দুর্গতিনাশিনী।
তৎপশ্চাদ্রামচন্দ্রেণ রাবণস্য বধাথিনা।।’
অর্থাৎ মহারাজা সুরথ প্রথমে দুর্গতিনাশিনী দুর্গার পুজো করেছিলেন তারপর রাবণকে বধ করতে শ্রীরামচন্দ্র দেবীর পূজা করেছিলেন। তাই বলাবাহুল্য দেবী দশভূজা মহিষাসুরমর্দিনীর আরাধনা বঙ্গে বহুদিনের।

বঙ্গের এক প্রাচীন ঐতিহাসিক অঞ্চল শান্তিপুর, এই অঞ্চল বিখ্যাত রাস উৎসবের আভিজাত্যে এবং গৌরবে। তবে শুধু রাসযাত্রাই নয়, শান্তিপুরে সাড়ম্বরে পালিত হয় দুর্গাপুজো, কালীপুজো থেকে শুরু করে শিবপুজো। তাই বলাই যায় শাক্ত-শৈব এবং বৈষ্ণব এই তিনধারার মেলবন্ধন দেখা যায় এই ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থানে।

শান্তিপুরের এক প্রাচীন পরিবার মুখোপাধ্যায় পরিবার, যারা আরও পরিচিত চাঁদুনীবাড়ি বলেই, সেই পরিবারে বহুবছর ধরে দেবী কাত্যায়নীর আরাধনা হয়ে আসছে। এই বাড়ির পূর্বপুরুষ হলেন কাশীনাথ সার্বভৌম, তিনি ছিলেন শ্রীশ্রীচৈতন্যদেবের গৃহশিক্ষক। শান্তিপুরে শ্রীশ্রী মহাপ্রভু চৈতন্যদেব প্রায়শই আসা যাওয়া করতেন। তৎকালীন সময় শান্তিপুর ছিল শৈবতীর্থ ও তন্ত্রসাধনার পীঠস্থান সাথে সাথে প্রাচীন যুগল বিগ্রহসেবাও অব্যহত ছিল। এই চাঁদুনীবাড়িতে বহুদিনের প্রাচীন কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয় আজও নিষ্ঠার সাথে, যার সূচনা আনুমানিক ১৫১০সালে। পরিবারের সদস্যদের থেকেই জানা যায় যে এই পরিবারের দুর্গাপুজো প্রায় তারও আগে শুরু হয়েছিল, অর্থাৎ এই পরিবারের কাত্যায়নীর আরাধনা ৫০০বছরেরও প্রাচীন।

বলাবাহুল্য শান্তিপুরের এই চাঁদুনীবাড়ির দুর্গাপুজো শুধুমাত্র শান্তিপুরেরই নয়, গোটা নদীয়া জেলার সবথেকে প্রাচীন পুজো। এখন এই বাড়ির দুর্গাপুজো যে ঠাকুরদালানে অনুষ্ঠিত হয় অতীতে সেখানে হত না, আটচালায় পুজো হত আগে, প্রায় ২৫০বছর আগে এই মুখোপাধ্যায় বংশের সপ্তমপুরুষ যদুনাথ মুখোপাধ্যায় বাড়ির পেছনে জমি কেটে সেই মাটি দিয়ে তৈরি ইট থেকে দুর্গা ও কালী পুজোর জন্য আলাদা দুটি মন্দির তৈরি করেন বর্তমানে সেই দুই পৃথক মন্দিরে পুজো হয়ে আসছে।

পরিবারের পুজো শুরু হয় জন্মাষ্টমীর পরের দিন বাড়ির কুলপুরোহিত দেবীর গায়ে মাটির প্রলেপ লাগানোর মধ্যদিয়ে। দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন সকালে পরিবারের মহিলারা গঙ্গায় স্নান করে মায়ের তিনটি ঘট ভরে আনেন। সেই ঘট সন্ধ্যায় বসিয়ে মায়ের বোধন শুরু হয়। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন প্রথমে পরিবারের গোপাল ও চাঁদুনীমায়ের পুজো হয় তারপর দুর্গার পুজো হয়।

শান্তিপুরের চাঁদুনীবাড়িতে পুজোর দিনগুলিতে দেবীর ভোগে থাকে- খিচুড়ি, আটভাজা, সাদাভাত, শুক্তনি, ডাল, দুই রকমের তরকারি, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি। তবে এই বাড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল পাকা কলার বড়া আর চালতার টক অবশ্যই দিতে হয় দেবীর ভোগে। শান্তিপুরের চাঁদুনীবাড়িতে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয় না। এই বাড়িতে পুজোর একদিন অর্থাৎ মহানবমীর দিন আমিষভোগ দেওয়া হয় ইলিশমাছ দিয়ে। পরিবারের বিশ্বাস বছরে একবার তাদের বাড়ির মেয়ে আসেন শ্বশুড়বাড়ি থেকে তাই একদিন আমিষভোগের আয়োজন করা হয় মেয়ের জন্য।

দশমীর দিন দেবীর জন্য পান্তা ভোগ ও ইলিশমাছের টক দিয়ে ভোগ দেওয়া হয় বলেই জানালেন পরিবারের সদস্য শ্রী সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। যেহেতু দশমীর দিন উমা আবার কৈলাসে ফিরবেন তাই বাড়ির সদস্যরা পান্তাভাতের সাথে দেন সমস্তরকম গোটা মশলা যাতে শ্বশুরঘরে ফিরে আবার রান্নার আয়োজন করতে না হয়। দশমীর দিন অঞ্জলির বদলে বিশ্বের শান্তি ও সকলের মঙ্গলের জন্য মায়ের কাছে স্তবপাঠ করা হয় যেন তিনি সকলকে অভয়দান করেন।

এই দুর্গাপুজোর দশমীর দিন থেকেই আবার কালীপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় এই চাঁদুনীবাড়িতে, অর্থাৎ দশমীর দিন পরিবারের বয়ঃজেষ্ঠ্যা সদস্যা চাঁদুনীমায়ের পাটে মায়ের গায়ে মাটি দেন তারপর থেকেই শুরু হয়ে যায় কালীপুজোর প্রস্তুতি, তাই এইবাড়িতে বিজয়া দশমীর কোন অনুষ্ঠান পালন করা হয় না। বিকালে দেবীবরণের পর উমা কাঁধে করে বিসর্জনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এই বাড়ির বিশেষ হল পুজোর সাথে জড়িত সকলেই বংশপরম্পরায় এই বাড়িতেই আসছেন প্রাচীন রীতি মেনেই। ব

র্তমানে মুর্তি গড়ার কাজে রয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী শ্রী সুধীর রঞ্জন পাল মহাশয়। আর প্রাচীন দিনের মতও ঐতিহ্যের সাথে এবং আভিজাত্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে আজও নিষ্ঠার সাথে পুজো করে আসছেন শান্তিপুরের চাঁদুনীবাড়ির সদস্যরা।
তথ্য লিপিবদ্ধেঃ শুভদীপ রায় চৌধুরী

The post দশমীর দিন পান্তাভাত ও ইলিশমাছের টক নিবেদন করা হয় দেবীকে appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.



from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper https://ift.tt/2ZMyc8A
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post