এবারের বঙ্গ ভোট এবং হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা

কলকাতার বাংলা সংবাদপত্রে দুটি খবর সম্প্রতি চোখে পড়লো। প্রথম খবরটি হলো, মধ্যপ্রদেশের ছিন্দবাড়ার বাসিন্দা মুসারিফ খানের কাহিনী।অষ্টম শ্রেণীতে পড়া মাত্র বারো বছর বয়সি মুসারিফ ভগবত গীতার পাঁচশো শ্লোক ঝর ঝর করে বলে দেয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুধু ঝর ঝর করে গীতার শ্লোক আউড়ে যাওয়া নয়, প্রতিটি শ্লোকের অর্থ সে এখন ভালো করে আত্যস্থ করে ফেলেছে। এ এক বিস্ময় বালিকা ! জানা গিয়েছে, মেমারি রিটেনশান কোর্স মধ্যপ্রদেশে বারো বছর বয়সি মুসারিফ সেই পাঠ্যক্রম থেকে অনুশীলনের জন্য বেছে নেয় ভগবত গীতাকে। তিনটি বিকল্প তাকে দেওয়া হয়েছিল।

প্রথম বিকল্প একটা গোটা ডিকশনারি মনে রাখার চেষ্টা, দ্বিতীয় বিকল্প সংবিধান আর তৃতীয় বিকল্প হলো ভগবত গীতা। ভগবত গীতার সাতশো একটির মধ্যে পাঁচশো শ্লোক গর গর সে আজ বলে দিতে পারে। এই স্মৃতিধারণের কৌশলটি শিখতে মুসারিফকে সাহায্য করেছেন অ্যাবাকাস এবং বৈদিক গণিতের শিক্ষিকা রোহিনী মেমন। শিক্ষিকা রোহিনী মেনান বলেছেন, মুসারিফ ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে ভগবত গীতার শ্লোকটা মনে রাখা শুরু করেন এবং অনেকেই মুসারিফের মতো ভগবত গীতায় বিকল্প নিয়েছিল কিন্তু মুসারিফ সবচেয়ে বেশি শ্লোক মুখস্থ রাখতে পেরেছে। মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ হয়েও কোনো ধর্মীয় চ্ছুৎমার্গ না রেখে শিক্ষার জন্য গীতাকে বেছে নেওয়া সেটাও কিন্তু সম্ভব হয়েছে তাঁর পরিবারের সমর্থনের ফলে।

শুধু গীতার শ্লোক নয়, এখন সে কোরানের আয়াত মুখস্থ করে ফেলেছে। এই বারো বছরের মেয়েটির এখন ইচ্ছা যে বাইবেলের মতো ধর্মগ্রন্থ যদি সে একই ভাবে মুখস্থ করতে পারে। এই খবরটি পড়ে বেশ আনন্দ হলো। কিন্তু পাশাপাশি আরেকটি খবর দেখে মনটা বিষণ্ণ হলো ! দ্বিতীয় খবরটি হলো, নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি মেনে এক অভিনব পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র। আপাতত দেশের একশোটা মাদ্রাসায় বাধ্যতামূলক ভগবত গীতা এবং রামায়ণ পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন মোদি সরকার। মাদ্রসা পড়ুয়াদের অবগত করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওপেন স্কুলিং এর অন্তর্গত মাদ্রাসা গুলোতে অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে প্রাচীন ভারতীয় দর্শন এবং হেরিটেজ পাঠক্রম।

এই পাঠক্রম পাঁচশোটা মাদ্রাসায় আপাতত চালু করা হবে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিয়াল নিশাঙ্ক নয়া দিল্লিতে এই পাঠক্রমের উন্মোচন করেছেন।

এই দ্বিতীয় খবরটি পড়ে মনে হলো বেদ, গীতা, রামায়ণ পড়াটা খুবই আনন্দের। খুশির কথা। শুধু মুসলমান সমাজ নয়, হিন্দু সমাজেরও এই বেদ, গীতা এবং উপনিষদ পড়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। কিন্তু সরকার বাধ্যতামূলক করছে কেন ? সাধারণ সিলেবাসে হিন্দু ছাত্রদেরও তো গীতা বাধ্যতামূলক নয়।

আমাদের নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে তো মধ্যশিক্ষা পর্ষদের বাইরেও ভারতীয় সংস্কৃতি বলে একটি আলাদা পাঠক্রম ছিল এবং তার ইন্টারনাল পরীক্ষা হতো। সেখানে কিন্তু ভারতীয় দর্শন, বেদ, উপনিষদ পড়ানো হতো। স্বামী লোকেশ্বরানন্দের লেখা গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন অফ ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত একটি বই এব্যাপারে আমাদের সিলেবাসে রাখা হয়েছিল। সেটি সরকারি ভাবে নয়। তবে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন এটি করতো। আমি জানিনা সেন্টজেভিয়ার্স স্কুল বা কলেজে এই ধর্মীয় পাঠাভ‍্যাস সিলেবাসে আছে কি না।

মাদ্রাসা গুলিতে কোরান পড়ানো হয় কিন্তু সেখানে গীতা উপনিষদ পড়ানো হয় কিনা আমি জানি না। মূল বিষয় টা হলো যে সব কিছুই পড়তে হবে এবং সব কিছু জানতে হবে কিন্তু তার মধ্যে একটা উদারতার বিষয় থাকবে। অর্থাৎ কোনো ভাবে একটা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাদের স্টিম রোলার চাপিয়ে সংখ্যালঘুদের সরকারি ভাবে একটা পাঠ্যপুস্তককে পড়ানো বাধ্যতামূলক পড়ার মধ্যে রাজনৈতিক পেশি প্রদর্শন থাকে, তাতে কিন্তু সব সময় মানবতার প্রকৃত বিকাশ হয়না।

অধুনা ভারতীয় রাজনীতিতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সময় হিন্দু এবং মুসলমান এই মেরুকরণের রাজনীতি এক প্রবল ভাবে প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ব্রিগ্রেডের জনসভায় কংগ্রেস সিপিএমের সঙ্গে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট সিদ্দিকীর জোট নিয়ে অনেক লেখালিখি হচ্ছে। প্রশ্ন একটাই যে মুসলিম তোষণ আর মুসলিম উন্নয়ন এই দুটি বিষয় কি এক?

মুসলিম তোষণের রাজনীতি দীর্ঘদিন ভারতে হয়েছে। ‘৪৭ সালে দেশের স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনে এই মুসলিম তোষণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই যে বিজেপির এহেন রাজনৈতিক উত্থান এ দেশে হয়েছে তার পেছনেও মুসলিম তোষণ একটা বড়ো কারণ।

এই কার্যকারণ সম্পর্কটা একটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। মুসলিম সেপারেটিজম থেকে আরও বেশি করে বিজেপির হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা নামক ধারণার উত্থান। সুমিত সরকারের মতো মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা অবশ্য বলেছেন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব হিন্দু জাতীয়তাবাদী উচ্চবিত্ত অভিজাতদের হাতে চলে যাওয়ায় মুসলিম দরিদ্র সমাজ আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে, কতিপয় মুসলিম অভিজাত সেই দরিদ্র মুসলমান সমাজকে নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদের রাজনীতি করেন। ব্রিটিশ সেটাকে আরও বেশি করে মদত দিয়ে ডিভাইড অন্ড রুল করে নিজেদের ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করার চেষ্টা করে। পরিণতি হিসাবে শেষ পর্যন্ত দেশ ভাগ হয়।

হিন্দু মহাসভা এই নাম দিয়ে কেন স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের সংগঠন তৈরি হবে ? কেন বিপ্লবীরা হাত কেটে রক্ত বের করে মা কালীর কাছে সেই রক্ত সমর্পণ করে তারপরে বোমা ছুঁড়তে যাচ্ছে। এই সমস্ত ঘটনাবলি মুসলমান সমাজকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে। এটা হলো ইতিহাসে এই হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্মের একটা কারণ।

আবার স্বাধীনতার পর মুসলিম তোষণের ফলে তার প্রতিবাদী anti thesis হিসাবে আরএসএস তারপর জনসঙ্ঘ তারপর বিজেপির উত্থান হয়েছে। সুতরাং এটা একই মুদ্রার দুটি পিঠ। মুসলিম লীগের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু একদা হয়েছে। ভারতে প্রথম তিরিশের দশকের যে নির্বাচন সেখানে কিন্তু সবথেকে বেশি ভোট মুসলিম লীগ পেয়েছিল এই বঙ্গদেশে। ফজলুল হক এবং তার আগে সোরাবর্দি এবং কলকাতার বিখ্যাত দাঙ্গা সেই ইতিহাসও আজও আমরা ভুলিনি।

আজ এত বছর পর পচিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুধুমাত্র মুসলমান সমাজের জন্য একটি পৃথক রাজনৈতিক দল গঠন হচ্ছে। সেটা ঠিক না ভুল, উচিত না অনুচিত এ প্রশ্ন উঠেছে। আগামী ভবিষ্যত বিচার করবে, যে এই পৃথক রাজনৈতিক দলটি গঠন করে আসলে মুসলিম সমাজের কণ্ঠস্বর আরও উচ্চকিত হলো নাকি ফুরফুরা শরীফের যে পরম্পরা যে দলের রাজনীতি না করে মানবতাবাদের কথা বলার যে পরম্পরাটা ভাঙ্গলো এই সিদ্দিকীর সেকুলার ফ্রন্ট। এ সবই রাজনৈতিক বিতর্ক।

কিন্তু আসল কথা হল যে আমরা বহুত্ববাদে যদি বিশ্বাস করি তাহলে আমরা সমস্ত ধর্মের মধ্যে দিয়ে একটা ঐক্যসাধনার কাছে পৌঁছাবো। সে তো হিন্দু ধর্মের মধ্যেও নানান মত পার্থক্য আছে। প্রাচীন উপাসনা শাস্ত্র পদ্ধতিতে বেদ এবং তন্ত্র সুদীর্ঘ কাল ধরে পাশাপাশি প্রাচীন ভারতে প্ৰচলিত ছিল। তন্ত্রশাস্ত্রের বৈশিষ্ট্য গুলো আলোচনা করলে জানা যায়, যে এই সব অনুষ্ঠান বিভিন্ন দেশে মানুষের মধ্যে নানা ভাবে চলে এসেছে। তন্ত্রের যে ষট্কর্ম ও কৌলাচারের অনুরূপ ক্রিয়া উপাসনায় মদের ব্যবহার মন্ত্রশক্তিতে বিশ্বাস, বিভিন্ন প্রাচীন জাতির সংস্কৃতির পর্যালোচনা করলে সেগুলো অবগত হওয়া যায়। তন্ত্রের যে পঞ্চতত্ত্ব সেখানে সাধনা রূপে মদ্য, মাংস, মস্য ,মুদ্রা ও মৈথুনের কথাও উল্লিখিত আছে। কিন্তু এই যে মতবাদ, সেই সব আচার অনেক হিন্দু মানেননা। হিন্দু ধর্মের অন্যান্য বহু দর্শন এবং ভাবনার মতপার্থক্য আছে।

বাঙালি মাত্রই শাক্ত অথবা বৈষ্ণব। বৈষ্ণব ধর্মের বীজ শাক্ত ধর্মে অথবা তন্ত্রাচারে আছে। শুধু তাই নয়। ভারতীয় ধর্ম সাধনার মূল কান্ডটাও তন্ত্র নির্ভর। তাই এই হিন্দু ধর্মের মধ্যে যেরকম বৈচিত্র্য আছে। আবার বাঙালির বাঙালিত্ব বলে একটা পরিচয় আছে। যার ফলে ভারতের বুকে আর একটা বিশিষ্ট ভূমিকা আছে। বাঙালির শাস্ত্র সম্মত ইতিহাস, বাঙালিয়ানার ইতিহাস অরচিত থেকে গেল কী?

বাঙালির জাতিগত যে একটা ভাবরূপ আছে যেটা জাতিগত সংস্কারের পথ ধরে সেটা নির্ধারিত রূপ লাভ করতে পারলো কী ? আসলে বাঙালির সাধনার পথ কিন্তু বিশাল সমুদ্রের মতো। নানাদিক থেকে নদীর ধারা এসে তার মধ্যে আত্মসমর্পণ করেছে। তাই বার বার মনে হয়, যে আজ বাংলা তথা ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংখ্যালঘুর সংঘাত কাঙ্খিত নয়। হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা কাঙ্খিত নয়। মুসলিম উগ্র বিচ্ছিন্নতাবাদী জনমত ও বর্জনীয়।

এটাতো মুসলমান সমাজের ও গর্বের কথা। যে ভারত ভাগের বিরুদ্ধেও মুসলিম জনমত ছিল। আল্লা বকশের উত্তরাধিকার ভারতীয় মুসলমান সমাজেও আছে। তাই আমাদের এখন উচিৎ ঐক্যের সাধনা। সেই ঐক্যের সাধনার মধ্যে দিয়ে অতীত এবং বর্তমানকে সহজ উপলব্ধির স্তরে আমরা নিয়ে আসতে পারি। তখন আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভুল গুলোকে শুধরে আমরা একটা নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখতে পারি। পশ্চিম বঙ্গে এবারে এই ঐক্য র বাণী দেখছি কই ?

The post এবারের বঙ্গ ভোট এবং হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.



from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper https://ift.tt/3dxG83c
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post