ঔরঙ্গজেবের সময়কার সেই পুজোতে আজও মেতে ওঠেন মুখোপাধ্যায় বাড়ির সদস্যরা

শুভদীপ রায় চৌধুরী, আসানসোল:  আর কিছুদিন, তারপরই ঢাকের বাদ্যিতে মেতে উঠবে গ্রাম থেকে শহর উৎসবের মেজাজে। আপামোর বাঙলি দলে দলে পৌঁছে যাবে বারোয়ারি পুজোমণ্ডপ সহ বনেদিবাড়ির ঠাকুরদালানে। বনেদিবাড়িতে উৎসবের এখন চূড়ান্ত পর্যায় চলছে, কোথাও দেবীপ্রতিমা রঙ হচ্ছে, কোথাও বানানো হচ্ছে নাড়ু, গজা ইত্যাদি মিষ্টি আবার কোথাও টাঙানো হচ্ছে বিরাট বিরাট ঝাড়বাতি। উমা আসার আনন্দ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ঠাকুরদালানের প্রতিটি কোণায়।

প্রতিটি বনেদিবাড়ির বিভিন্ন রীতিনীতি যা বহুবছর ধরে পালন করে আসছেন পরিবারের সদস্যরা। তেমনি এক প্রাচীন পরিবার হল, আসানসোলের মুখোপাধ্যায় পরিবার যাদের পুজো শুরু হলেছিল ঔরঙ্গজেবের সময় থেকে এবং এখনও সেই পুজো হয়। আজকের পুজোপর্বে সেই বাড়ির পুজোই আলোচনা করা হল।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের সময়ে আসানসোলের কিছু বাসিন্দা মিলে ছোড়া গ্রাম তৈরি করেন। তৎকালীন সময়ে বর্গী আক্রমণ হত, সেই আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি ছোড়া গ্রামও। ঠিক সেই সময়ে বর্গীদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বহু লোক গ্রাম ত্যাগ করে পালিয়ে যায় এবং বহু লোক প্রাণ হারায়। বর্গী হামলার সময় গ্রামের সবাই মুখোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যদের গ্রামের মোড়ল বা সর্দার বলত। সেই মুখোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা দেবী দুর্গার কাছে মানত করেন যে বর্গী হামলা যদি কমে যায় এবং গ্রামের লোক যদি আবার গ্রামে ফিরে আসে তাহলে তারা দেবীর পুজো করবেন। এরপর বর্গীহানা কমতে থাকে এবং দলের সেনাপতি মারা যায়। তারপর গ্রামের লোকেররা ফিরে এলে মুখার্জী বাড়িতে শুরু হয় দুর্গাপুজো। যে পুজো আজও হয়ে আসছে নিষ্ঠার সঙ্গে।

এই বাড়িতে পুজোর চারটি দিন সদস্যরা নিরামিষ আহার করেন। সপ্তমীর দিন দেবীর সামনে একটি প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয় যা দশমী অবধি প্রজ্জ্বলিত অবস্থায় থাকে। মুখার্জী বাড়িতে পুজোর সময় দেবীকে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়, ভোগে থাকে- সাদাভাত, নানান রকমের ভাজা, শুক্তনি, মুগের ডাল, তরকারি, পায়েস, মিষ্টি ইত্যাদি। তবে পুজোর তিনদিন অন্নভোগ হলেও দশমীর দিন দেবীকে মাছপোড়া দেওয়া হয়।

মুখোপাধ্যায় পরিবারে ভোগ দেওয়ার কিছু ভিন্ন রীতি রয়েছে। সপ্তমীর দিন দুপুরে অন্নভোগ হয়, সকালে চালের নৈবেদ্য সাথে নাড়ু, মিষ্টি দেওয়া হয় এবং সন্ধ্যায় মুড়কি, নাড়ু, চিরে নিবেদন করা হয়। মহাষ্টমীর সন্ধিপূজায় দেবীকে লুচিভোগ ও পায়েস দেওয়া হয়। তবে পায়েস তৈরির বেশ কিছু বিশেষত্ব রয়েছে এই বাড়িতে। যিনি পায়েস করবেন তিনি সারাদিন উপোস করে থাকবেন এবং মহাষ্টমীর বলিদানের আগে তাকে স্নান করে ভিজে পোশাকে পায়েস রান্নার সরঞ্জাম প্রস্তুত করতে হবে। তবে যখন বলিদান হবে সেই ঢাকের বাদ্যি শুনে সেই সময় চাল ও দুধ চাপাতে হবে। পায়েস একবার ফুটলেই ওই গরম অবস্থায় সেটি মন্দিরে নিয়ে যেতে হবে। আতপচাল সেদ্ধ হলে হবে না কারণ দেবী এই বাড়িতে চালচাল পায়েস গ্রহণ করেন। পুজোর পর সেই পায়েস গ্রহণ করে পরিবারের সদস্যরা উপবাস ত্যাগ করেন।

মহানবমীর দিনও একই রীতিতে অন্নভোগ হয় এবং দশমীর দিন দেবী মাছ পোড়া গ্রহণ করেন। বিজয়ার দিন দেবী লক্ষ্মীকে বরণ করা হয় না এই বাড়িতে। মা লক্ষ্মীকে রেখে দেওয়া হয়। দর্পন বিসর্জনের পর বাড়ির পুরুষ সদস্যরা সবাই অপরাজিতার লতা ধারন করেন হাতে কারণ তাদের বিশ্বাস যে মায়ের সামনে অপরাজিতা পরলে কখনও পরাজয় হবে না তাই এই নিয়ম। মা দুর্গার বিজয়ার আগে যাত্রা বাঁধানো হয় যাতে সারা বছর সবাই ভালো থাকে। বিসর্জনের রীতি অনুযায়ী সিঁদুরখেলা হয়। এমনকি বিসর্জনের পর উমার অষ্টমঙ্গলাও অনুষ্ঠিত হয় এই বাড়িতে। আবার একটা বছরের অপেক্ষা উমা আসার, আসানসোলের মুখার্জী বাড়ির সদস্যরা এইভাবেই পুজো করে আসছেন এত বছর ধরে পরম্পরার সাথে।

তথ্যসূত্র লিপিবদ্ধেঃ শুভদীপ রায় চৌধুরী

The post ঔরঙ্গজেবের সময়কার সেই পুজোতে আজও মেতে ওঠেন মুখোপাধ্যায় বাড়ির সদস্যরা appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.



from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper https://ift.tt/3k8rIZi
إرسال تعليق (0)
أحدث أقدم